এই মাত্র পাওয়া :

বাংলাদেশ , মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

ছাদ বাগান লাভজনক করতে করণীয়

লেখক : admin | প্রকাশ: ২০২০-০৮-১৭ ২০:৫১:২৫

-ডক্টর মো. জামাল উদ্দিন-

 


বর্তমান সময়ে ছাদ বাগান একটি অতি পরিচিত নাম। শহুরে এলাকায় যারা বসবাস করেন তাদের প্রায় বাড়ীর ছাদে ছাদ বাগান দেখতে পাওয়া যায়। দিন দিন এ সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এটা ছাদ বাগান থেকে ছাদ কৃষি বা রুফ টপ ফার্মিং এ পরিনত হচ্ছে। কারন মানুষ দিন দিন সৌখিন প্রিয় হচ্ছে, নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাবার বা কৃষি পণ্য খুঁজছে। বাজার থেকে সাধারণত: যেসব শাক-সব্জি ও ফলমুল আমরা প্রতিনিয়ত কিনে খাচ্ছি তা বিষমুক্ত এ কথা বলা যাবে না। বিশেষ করে এই করোনাকালীন সময়ে এটার প্রতি মানুষের দুশ্চিন্তা ও আতংক অনেকগুণ বেড়ে গেছে। তাই শহুরে মানুষ চায় বিষমুক্ত এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ শাক-সব্জি ও ফলমুল। এর জন্য ছাদ কৃষিই একমাত্র এসবের উত্তম যোগানদাতা হতে পারে।

 



তাছাড়া আবহাওয়াগত পরিবর্তনের বলে দিন দিন বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। এর প্রভাব গ্রামের চাইতে শহুরে বেশি। ফলে গরমের সময় শহুরে বসবাসকারী মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। শহুরে ছাদ বাগান বাড়ির ছাদের তাপমাত্রা যেমন নিয়ন্ত্রণ করে ঘরকে শীতল রাখে ঠিক তেমনি অক্সিজেন সরবরাহ বাড়িয়ে বায়ুমন্ডলকে ঠান্ডা করে মানুষের মনে প্রশান্তি এনে দিতে পারে। তাই বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা ছাদ বাগানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আর এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নগরীর তাপমাত্রা কমানোর জন্য কৃত্রিম উদ্যান স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বা হচ্ছে। যেমন ভিয়েতনাম ও সিংগাপুরসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে রাস্তার ফুটপাতগুলো সবুজ ঘাসে আবৃত করা হচ্ছে। টোকিও মেট্রোপলিটন সরকার নতুন ছাদের ন্যূনতম ২০ শতাংশ জায়গায় বাগান সৃজন বাধ্যতামূলক করে ২০০১ সালে একটি আইন পাশ করেছে। যার ফলশ্রুতিতে টোকিওর গড় তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি ফানেহাইট হ্রাস পেয়েছে।

পাকা বাড়ির খালি ছাদে অথবা ব্যালকনিতে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে বিভিন্ন রকম শাক-সব্জি, ফল, ফুল, ঔষধী গাছসহ সৌখিন ধরণের বিভিন্ন গাছের বাগান গড়ে তোলাকে ‘ছাদ বাগান’ বলা হয়, ইংরেজিতে একে বলা হয় রুফ টপ গার্ডেন। নিরাপদ ও তাজা শাক-সব্জি, ফল-ফুল পেতে, পরিবেশ দূষণ মুক্ত রাখতে, জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণে, বাড়ির পরিবেশ সুশীতল ও শান্তিময় রাখতে, বিনোদন ও অবসর সময় কাটাতে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে ছাদ বাগানের গুরুত্ব অপরিসীম।

ছাদ বাগানকে লাভজনক ভাবা বা লাভজনক করা কঠিন কাজ। এটি একটি আপেক্ষিক বিষয় ও বটে। ছাদ বাগান বা ছাদ কৃষির ধরণা বা প্রকৃতি ভিন্নতর। অন্য কৃষিতে যেমন মোট উৎপাদন মূল্য থেকে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে লাভজনকতা হিসাব করা হয়, ছাদ কৃষিতে তা কঠিন। এখানে উৎপাদন মূল্যের পাশাপাশি এসথেটিক বা মনস্তাত্বিক ভ্যালু, স্যোসাল বেনিফিট অনেক বেশি। যা আর্থিকভাবে হিসাব করা বেশ কঠিন। তবে কিছু বিষয় মেনে চললে, প্রথমদিকে উপকরণ খরচ কমাতে পারলে, চারা কলমের সঠিক যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে ফলন অধিকহারে বাড়াতে পারলে ছাদ বাগান ও একটি লাভজনক পেশা হিসাবে আর্ভিভূত হতে পারে এতে কোন সন্দেহ নেই।



ছাদ বাগানকে লাভজনক করা ছাদ বাগানীর যেমন দায়িত্ব বা ভূমিকা রয়েছে ঠিক তেমনি সেবা প্রদানকারী সংস্থা যেমন কৃষি গবেষণা, কৃষি বিভাগ, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সহ সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সং¯হা বা সিটি কর্পোরেশনেরও ভূমিকা আছে। যেমন ধরা যাক ছাদ বাগানীর ভূমিকার কথা, গুজুগের বা বিলাসীতার বশবতী হয়ে ছাদ বাগানীরা যেন অধিক মূল্যে চারা কলম বা কনটেইনার না কেনা। প্রয়োজনে দর যাচাইয়ের জন্য অনেকগুলো উৎস অনুসন্ধান করা, কৃষি অফিস বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে পূর্বেই যোগাযোগ করা, ক্রয়ের পূর্বে চারা বা কলমের জাত সর্ম্পকে নিশ্চিত হওয়া এবং সে সবের উৎপাদন কৌশল জেনে নেওয়া ইত্যাদি। আর কৃষি গবেষণা কেন্দ্রসমূহ ছাদ বাগান সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ের উপর লাভজনক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের উপর জোর দেওয়া, ছাদ বাগানীদের চাহিদা মোতাবেক উন্নত জাতের চারা বা কলম স্বল্প মূল্যে প্রযুক্তির পূর্ণ প্যাকেজসহ সরবরাহ করা, প্রশিক্ষণ ও কারিগরী পরামর্শ প্রদান করা। যদিও ছাদ বাগানের উপর বারি’র প্রধান কার্যালয়ে গবেষণা চলমান। এর ফলাফল দ্রুত সম্প্রসারণ জরুরি।

শহর কেন্দ্রিক কৃষি গবেষণা এবং আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রসমূহে ছাদ বাগানীদের চাহিদা মোতাবেক গবেষণা কর্মসূচী হাতে নেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে এসব কর্মসূচি গবেষণার মেইন স্ট্রীমে বা খাতে নিয়ে আসা যেতে পারে। নতুবা সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো নিয়ে ছাদ বাগান সর্ম্পকিত সমন্বিত মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। অন্যদিকে, মেট্্েরাপলিটন কৃষি অফিস ও ছাদ বাগানের উপর বিভিন্ন প্রর্দশণী স্থাপন করতে পারে। যদিও তাঁরা স্বল্প পরিসরে করে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদারকরত: কৃষি গবেষণার সাথে সংযোগ সাধন করে ছাদ বাগানের উপর কাজ করলে অচিরেই ইহা একটি লাভজনক ও আকর্ষণীয় নগর কৃষিতে পরিনত করা সম্ভব হবে। তবে এর জন্য সংশ্লিষ্ট কৃষি গবেষণা ও মেট্্েরাপলিটন কৃষি অফিসগুলোতে জনবল সহ সক্ষমতা বৃদ্ধি করাও জরুরি। সবুজ নগরায়ন কার্যক্রমের অংশ হিসাবে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও সিটি কর্পোরেশন, ছাদ বাগানীদেরকে বিভিন্ন রকম উৎসাহ ব্যঞ্জক উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে যেমন ছাদ বাগান উপযোগী বাড়ির নকশা প্রণয়নে সহায়তা করা, হোল্ডিং ট্যাক্স কমানো বা মওকুফ করা ইত্যাদি। বিপনন অধিদপ্তর ছাদ বাগানীদের উৎপাদিত অতিরিক্ত পণ্য মার্কেটিং এ সহায়তা প্রদান করতে পারে।



ছাদ বাগান থেকে আহরিত শাক-সব্জি ফলমুল বেশিরভাগ ছাদ বাগানী ৯০-৯৫% নিজেরাই ভোগ করে থাকে। আর বাকী ৫-১০% আত্নীয় স্বজন বা প্রতিবেশীর মধ্যে উপহার হিসাবে বন্টন করে থাকে। এতে সামাজিক বন্ধন ও দৃঢ় হয়। তবে এখনো পর্যন্ত ছাদ বাগানে উৎপাদিত কোন সব্জি বা ফল বাহিরে বিক্রি করতে দেখা যায়নি। কেননা যা ফলন হয় তাতে পারিবারিক চাহিদা পূরনে শেষ হয়ে যায়। ছাদ বাগান লাভজনক করতে হলে বিদ্যমান বাগানের উৎপাদনশীলতা অর্থাৎ প্রতিটি ফসলের ফলন বাড়ানোর উপর জোর দিতে হবে। আর যদি ফলন অত্যাধিক হয় তবে এগুলো বিক্রি করাও একটি চেলেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

সেক্ষেত্রে নিম্নোক্ত যেকোন উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে যেমন: (১) ছাদ বাগানে উৎপাদিত অতিরিক্ত কৃষি পণ্য আশেপাশের খুচরা বা পাইকারী বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা; (২) ছাদ বাগানীর বাড়ির পাশে ছোট্ট একটি বিক্রয় কেন্দ্র বা আউটলেট খোলা; (৩) ভ্যান গাড়ীতে সব্জি-ফল বিক্রেতাদের সাথে কনট্রাক্ট ভিত্তিক এসব পণ্য বিক্রি করা; (৪) আশেপাশের সুপারশপের সাথে যোগাযোগ করে সেসব পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা। তবে উৎপাদিত শাক-সব্জি ও ফলমুল প্যাকেজিং ও লেবেলিং সহকারে সরবরাহ করতে পারলে এর মূল্য বৃদ্ধি পাবে। এভাবে অতিরিক্ত পণ্য বিক্রির ব্যব¯হা করতে পারলে ধীরে ধীরে ছাদ বাগান একটি লাভজনক নগর কৃষিতে রুপান্তরিত হবে।



ছাদ বাগানকে আরো অধিক লাভজনক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়ে গবেষণা ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি: (১) ছাদ বাগানের একটি বিজ্ঞানসম্মত টেকসই উন্নত মডেল উদ্ভাবন করা; (২) ছাদ বাগান উপযোগী ফলের গাছ নির্বাচন, ফলন যাচাইয়ের উপর গবেষণা করা এবং ছাদ বাগান উপযোগী বছরব্যাপী শস্য পঞ্জিকা (ক্রপ ক্যালেন্ডার) তৈরি করা; (৩) বিদ্যমান ছাদ বাগানের বিভিন্ন শাক-সব্জি ও ফলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা; (৪) ছাদ বাগানের সার ও সেচ/পানি ব্যবস্থাপনার উপর গবেষণা করা; (৫) ছাদ বাগানের রোগ-বালাই দমনের জৈব পদ্ধতির উপর সমন্বিত গবেষণা করা; (৬) ছাদ বাগানীদের সাথে উপকরন সরবরাহকারীদের সাথে সংযোগ তৈরি করত: সার্ভিস প্রোভাইডার তৈরি করা; (৭) বিজ্ঞানী এবং সম্প্রসারন কর্মী যৌথভাবে ছাদবাগান নিয়মিত পরিদর্শন ও কারিগরী পরামর্শ প্রদানে পদক্ষেপ গ্রহন; (৮) উৎপাদিত অতিরিক্ত পণ্য বাজারজাতকরনে সহায়তা প্রদান করা; (১০) কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, মেট্রোপলিটন কৃষি বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট এনজিও ছাদ বাগানীদেরকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা; বিশেষ করে ভালো চারা কলম চিনিবার উপায়, ছাদ বাগান উপযোগী ফসলের জাত পরিচিতি, বেডে চারা উৎপাদন কৌশল/ছাদে মিনি নার্সারী ¯হাপন, কিচেন কম্পোস্ট তৈরির কৌশল, ছাদ বাগানে সার ও সেচ/পানি ব্যবস্থাপনা, রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং প্রযুক্তি, রোগ বালাই বা পোকামাকড় দমন, সব্জি বা ফল সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও লেবেলিং ইত্যাদি বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ প্রদান করা যেতে পারে। পরিশেষে, সেরা বাগানীকে পুরুস্কার প্রদানের ব্যবস্থা করা এবং মিডিয়াতে ছাদ বাগান বিষয়ে নিয়মিত বুলেটিন বা প্রতিবেদন প্রচার করা যেতে পারে। আর এসব কার্যক্রম সফলভাবে বেগবান করতে হলে ছাদ কৃষি গবেষণা বিষয়ক একটি সমন্বিত মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। আর এ কাজের মূল উদ্দেশ্য হবে পারিবারিক ছাদ কৃষি থেকে বেরিয়ে বানিজ্যিক ছাদ কৃষিতে রূপান্তর করা এবং সবুজে সমারোহে নগরায়ন গড়ে তোলা।

লেখক: ড. মো. জামাল উদ্দিন, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও কৃষি অর্থনীতিবিদ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ছাদ বাগান বিষয়ক প্রকল্পের প্রাক্তন ন্যাশনাল কনসালটেন্ট, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

Print Friendly and PDF