এই মাত্র পাওয়া :

বাংলাদেশ , রোববার, ১২ জুলাই ২০২০

রাঙ্গুনিয়ার মেধাবী মুখ- মা-বাবা হারা অদম্য ইব্রাহীম পেল জিপিএ-৫

লেখক : admin | প্রকাশ: ২০২০-০৬-০৪ ২০:২১:১৯

জগলুল হুদা, রাঙ্গুনিয়া :


ছোটকালে মা-বাবাকে হারিয়েছেন। থাকার জন্য ভিটেমাটি টুকুও নেই। আপন বলতে পৃথিবীতে রয়েছে নিজের বোন ও ছোট ভাই। ছোট ভাইকে নিয়ে বড় বোনের সাথে ভাড়া বাসায় থাকেন। এবার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পেয়েছেন জিপিএ-৫। প্রতিটি বিষয়ে তার ৯০ এর উপরে নাম্বার। এমনকি প্রাথমিকের পিইসি ও মাধ্যমিকের জেএসসি পরীক্ষাতেও তিনি টেলেন্টপুলে বৃত্তি সহকারে পেয়েছিলেন জিপিএ-৫।
শত প্রতিকূল পরিস্থিতিকে পিছনে ফেলে অদম্য গতিতে এগিয়ে চলা মেধাবী এই শিক্ষার্থীর নাম মো. ইব্রাহীম। বাড়ি রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ধামাইরহাট এলাকায়। এবার উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই ইব্রাহীমই একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী। পড়ালেখার উপযুক্ত পরিবেশের অভাব, দারিদ্রতার বাঁধা প্রতিমুহুর্তে, পড়ালেখার বই-খাতা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব। এমনকি দুইবেলা দুমুটো ভাতও তার জুটেনি ঠিকমতো। কিন্তু নিজের এমন পরিস্থিতিতেও থেমে থাকেনি ইব্রাহীম। পড়ালেখার প্রতি প্রবল আগ্রহে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, নিজের বড় বোন ও মামাদের সার্বিক সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণায় শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে ধাপে মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছে ইব্রাহীম। বড় হয়ে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যন্ত বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের সহযোগিতা থাকলেও এবার অর্থাভাবে উচ্চ শিক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে মেধাবী ইব্রাহীমের।
তার সাথে কথা বলে জানা যায়, ইব্রাহীম যখন দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র তখন তার দিনমজুর বাবা মারা যান। বাবার চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিজেদের ভিটেমাটিও বন্ধক রেখে হারিয়েছেন। বাবা মারা যাওয়ার ১০ মাসের মাথায় হারিয়েছেন নিজেও মাকেও। এরপর কোথায় যাবে, থাকবে কোথায় তারও কোন ঠিক ছিল না। পরিবারে তারা ২ ভাই ও ৩ বোন। বোনদেরও বিয়ে হয়ে যায়। ছোট দুই ভাইয়ের এই করুন অবস্থায় তাদের নিয়ে ভাড়া বাসায় উঠেন নিজের মেঝ বোন। মায়ের ¯েœহে তাদের বড় করে তুললেও দারিদ্রতার বাঁধায় বার বার পড়ালেখা বন্ধের উপক্রম হলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষকদের আন্তরিকতায় এখন পর্যন্ত ২০২০ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন এবং ছোটভাই মোজাম্মেলও এখন দশম শ্রেণির ছাত্র। অর্থাভাবে নিজের উচ্চ শিক্ষাটা শেষ করতে পারবেন কিনা তাই নিয়ে নির্বিকার ইব্রাহীম। তবে এগিয়ে চলার স্বপ্ন তার চোখেমুখে।
মো. ইব্রাহীম বলেন, আমি প্রতিদিন ৬-৭ঘন্টা পড়ালেখা করতাম। যখন বন্ধুরা খেলতে ডাকতো তখনও পড়তাম। পড়ার টেবিল ছোট হওয়ায় ছোট ভাইকে সুযোগ দিয়ে অনেক সময় আমাকে দাড়িয়ে পড়তে হতো। এভাবে এবার উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষা দিয়ে সফল হয়েছি। আমার স্কুলসহ শিক্ষক ও আমার মামারা এ পর্যন্ত অনেক সহযোগিতা করেছেন। বড় হয়ে প্রকৌশলী হতে চাই, কিন্তু আমার যা অবস্থা তাতে উচ্চ শিক্ষা চালাতে পারবো কিনা জানি না। আমি সকলের সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করছি।
ভাইয়ের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বড় বোন লাকী আক্তার বলেন, যখন সে ২য় শ্রেণীতে পড়ে তখন আমাদের বাবা-মা মারা যায়। এরপর আমার চাচারা তাদের এতিমখানায় দিয়ে দিতে বলে। কিন্তু আমি আমার এতিম ছোট দুইভাইকে দেখার জন্য স্বামীর অনুমতি নিয়ে ছোট একটি ভাড়া ঘরে দীর্ঘ ৮ বছর ধরে থাকছি। সংসারে অভাব অনটন থাকলেও তার পড়ালেখার প্রতি প্রবল আগ্রহ। সংসারের দারিদ্রতা দূর করে সে বড় হয়ে প্রকৌশলী হতে চাই এবং নিজেদের একটি ভিটেমাটি সহ ঘর নির্মাণ করতে চাই ইব্রাহীম। তিনি তার ভাইয়ের উচ্চ শিক্ষা অর্জনে সকলের দোয়া ও সহযোগিতা চেয়েছেন।
উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ইব্রাহীম খুব ভাল এবং মেধাবী শিক্ষার্থী। দারিদ্রতাকে পেছনে পেলে কিভাবে এগিয়ে যেতে হয়, তা ইব্রাহীম করে দেখিয়েছেন। এবার বিদ্যালয় থেকে ইব্রাহীমই একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী। সে দরিদ্র হলেও মেধাবী হওয়ায় বিদ্যালয়ের সব শিক্ষকরাও তাকে যথেষ্ট পছন্দ করতো। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে সম্পূর্ণ বিনাবেতনে পড়ানো হয়েছে। এমনকি সরকারি-বেসরকারি যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তার পড়ালেখায় সহযোগিতা করা হয়েছে। দারিদ্রতায় তার উচ্চ শিক্ষা অনিশ্চিত। সকলের সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে সে আরও ভাল করতে পারবে। আমি তার উজ্জ্বল ভবিষ্যত কামনা করি।

Print Friendly and PDF