বাংলাদেশ , শুক্রবার, ৫ জুন ২০২০

করোনা ও বাড়ি ফেরা কর্মসূচি: আমাদের বোধোদয় জাগ্রত হোক

লেখক : admin | প্রকাশ: ২০২০-০৫-২৩ ১১:৫৬:৫৭



-বদরুল ইসলাম মাসুদ-

 

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) পুরো বিশ্বকেই কাঁপিয়ে, কাঁদিয়ে, নাড়িয়ে দিচ্ছে। আক্রান্ত আর মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে প্রতিদিন। দুনিয়ার তাবৎ গবেষক, চিকিৎসক আর রাষ্ট্রনায়করা একত্রিত হয়ে করোনা থেকে রক্ষা/পরিত্রাণের জন্য নিরন্তর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। আমাদের দেশেও করোনা পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ শংকা প্রকাশ করে বলেছেন- ঈদের পর দেশে করোনা পরিস্থিতি মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই এখনই সর্তক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

কিন্তু বাস্তবে কি তা হচ্ছে? আমরা কোন পথে হাঁটছি? বিশেষজ্ঞদের কথাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবার জন্য আমাদের মাঝে মধ্যে নেয়া সিদ্ধান্তগুলো ‘করোনা’ পরিস্থিতিকে জটিল-কঠিন এবং ভয়াবহ করে তুলছে বলেই মনে হচ্ছে- এমন কাজ-কারবার দেখে।

আমরা মাঝেমধ্যে কিছু সিদ্ধান্ত দেখি, এতে করোনা (কোভিড-১৯) পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠছে। করোনা পরিস্থিতিতে আগে একবার রহস্যজনকভাবে গার্মেন্টস খোলার খবরে স্রোতের মত গ্রামে ফিরে যাওয়া কর্মীরা ‘চাকরি বাঁচাতে’ শহর/নগরমুখী; আসার পর আবার গার্মেন্টস বন্ধ, ততক্ষণে যা ক্ষতি হবার তা ঠিকই সবাই টের পায়/পেয়েছে/পাচ্ছে।



পরে আবারও শর্তযুক্ত করে গার্মেন্টস খোলার সিদ্ধান্ত, আবারও স্রোতের মতই কর্মীদের আগমন। স্বাস্থ্যবিধি কতটুকুই-বা মানা হলো? তর তর করে করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ল।

আবার ঈদকে সামনে রেখে কিছু শর্তজুড়ে মার্কেট খোলার ঘোষণায় হুমড়ি খেয়ে কেনাকাটায় ব্যস্ত হলেন অনেকে। পুলিশ আর ভ্রাম্যমাণ আদালত অযুত-নিযুত চেষ্টা করে যখন মার্কেটমুখী মানুষকে ঘরে ফিরাতে কিছুটা ‘সফল’ তখন আবারও মার্কেট খোলা হলো- এমন ঘোষণা। যদিও দেশের বড় বড় বিপণীগুলোর মালিকপক্ষই স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বন্ধ রাখলো। কিন্তু তাতে কি? ইতোমধ্যে কেউ কেউ তো বিনিয়োগ করেছেন, দোকান খুলেছেন, বানের স্রোতের মত ক্রেতাদের সরব (!) আনাগোনা…

এর মাঝে একবার বলা হলো-ঈদে বাড়ি না গিয়ে “যে যেখানে আছেন” সেখানেই ঈদ উদযাপন করতে। যেখানে উন্মুক্ত স্থানে ঈদ জামাতকে নিরুৎসাহিত (আপাতত: বন্ধই বলা যায়) করা হলো।
করোনা পরিস্থিতি নিয়ে যারা খুব ভাবেন-তারা সরকার এবং সংশ্লিষ্টদের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাল। কিন্তু আবার দুই/একদিন পরেই অদ্ভুত ঘোষণা- ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে বাপের বাড়ি (!) (পৈত্রিক/মাতৃক বাড়ি) যেতে পারবে। এ অদ্ভুত ঘোষণার পর আবারও মানুষ বানের স্রোতের মতই ‘গ্রামে ফেরা’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে মরিয়া…



যাদের ব্যক্তিগত গাড়ি (প্রাইভেট কার/মাইক্রো/সিএনজি অটোরিকশা) আছে তারা কিন্তু এ পরিস্থিতিতে গ্রামে যাবেন- এমনটা ভাবা ঠিক হয়নি। তাদের শহরে/নগরের ঘরে খাবার আছে, পকেটে/ব্রিফকেস/ড্রয়ারে টাকা আছে। তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই করোনা পরিস্থিতিতে ঘর (শহরে দালান/ফ্ল্যাট) থেকে বের হতে চাইবেন- এমনটা ভাবা ঠিক হয়নি। আবারও সেই সাধারণ মানুষগুলোই নাড়ির টানে বাড়ির পানে ছুটতে শুরু করলো। ফল- করোনা ঝুঁকি আশংকাজনকহারে বাড়ার।

মানুষ ‘প্রাইভেট কার/মাইক্রো’ ঠিকই নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে। তবে নিজেদের নয়, ভাড়া করা। এক একজন করে জড়ো হয়, আর ভাড়ায় প্রাইভেট কার/মাইক্রো চড়ে গ্রামে ফেরা কর্মসূচিতে মেতে উঠেছে। চট্টগ্রামে এ কান্ডটি একেবারে হাতেনাতে প্রমাণ। গতকাল শুক্রবার (২২ মে ২০২০) চট্টগ্রাম নগর থেকে বের হবার পথ সিটি গেইট এলাকায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত ৬টি প্রাইভেট কার ও দুটি মাইক্রো আটক করেছেন। যারা ভাড়ায় যাচ্ছিল বিভিন্ন স্থানে যাত্রী নিয়ে।

মানুষ কিন্তু সুযোগ পেলে বুঝে না বুঝে বানের স্রোতের মত ছোটে-এটা আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে (অন্য অনেক দেশেও এটা হয়) ‘সাধারণ মানুষগুলো’ আবেগপ্রবণ হয়ে ছুটে দলবেঁধে। এই করোনা পরিস্থিতিতেও সেটাই ঘটল।



আসলে যখন কোনো উৎসব আসে, ছুটি আসে, তখন মানুষ বাড়ি ফেরার তাড়নায় ছুটবেই।

তাহলে আগে কেন ঘোষণা দেয়া হলো- এবার করোনাময় দুর্যোগে যে যেখানে আছেন, সেখানেই ঈদ/ঈদের ছুটিতে থাকতে হবে।
পরে আবার কেন এটা শিথিল (নাকি শর্তটা বাতিল?) করা হলো? প্রাইভেট কারে গেলে কি করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়বে না? বিশেষজ্ঞরা তো আগেই সতর্ক করেছেন ঈদের মানুষ জামাতে (ঈদ জামাত) অংশ নেয়া, কিংবা আপনজনদের সাথে দেখা করার কারণে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

এমন আগাম সর্তকতার পরেও কেন এই সীমিত পরিসরে শর্তজুড়ে বাড়ি যাওয়ার সুযোগের ঘোষণা দেয়া হলো?

হয়তো এর দায় কেউ সরাসরি নেবেন না।



আমাদের কয়েকজন মন্ত্রী, এমপি, নেতা বলবেন, ‘বিষয়টা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেখছেন/দেখবেন’- সেই পুরোনো কথার পুনরাবৃত্তি এবারও হয়তো হবে-তাঁরা বলবেন। কিন্তু যে ক্ষতির শংকা সৃষ্টি হলো- সেটা কি এড়ানো যাবে? রক্ষা পাওয়া যাবে? আর সব কাজই যদি প্রধানমন্ত্রী-র উপর চাপিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে চান (যাঁরা চায়) তাহলে এতো এতো লোকবল কি কাজটা করছে!

আমরা করোনা পরিস্থিতি নিয়ে আগে অনেক কথা বলেছি। যা সত্যিকার অর্থে সেভাবে সফল হয়নি। বৈশ্বিক মহামারি করোনা নিয়ে হেলাফেলার সুযোগ নেই। এটা কাউকে ছাড়ছে না, কোথাও ছাড়ছে না। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি স্মরণকালে বিশ্ববাসী/বিশ্ব নেতৃত্ব দেখেননি-এটা বলা হচ্ছে। এমন অবস্থায় আমাদের নাজুক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মতই কি আমাদের পলিসি ব্যবস্থাও? কোনো অশুভ শক্তি যেন ঘাপটি মেরে বাংলাদেশকে ‘দাবিয়ে’ শংকার মধ্যে ফেলতে না পারে- এমন বিষয়ে আমাদের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।

বিশ্ব নেতৃত্ব এখন চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি মহান আল্লাহকে স্মরণ করার আহ্বান জানাচ্ছেন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও আগেই বলেছেন- এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহকে স্মরণ করতে-ইবাদত, বন্দেগী করতে। সেই সাথে করোনা পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশের স্বাস্থ্যবিধিকে কঠোরভাবে মেনে চলতে/পালন করতে-আহ্বান জানান।

আমরা যেন সে পথেই হাঁটি। বার বার কিছু ভুল সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ও দেশের মানুষকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলতে না পারে- এটা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের অবশ্যই বুঝতে/মানতে এবং মানাতে সচেষ্ট হতে হবে আরো বেশি বেশি করে।

আমাদের সবার বোধোদয় আরো জাগ্রত হোক- এ প্রত্যাশাই কাম্য।

বদরুল ইসলাম মাসুদ: সাংবাদিক
২৩ মে ২০২০

Print Friendly and PDF